ইসলাম ও জাহেলিয়াত বইটি মূলত মাওলানা সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী রাহিমাহুল্লাহ‘র একটি ভাষণ। ১৯৪১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পেশোয়ার ইসলামিয়া কলেজের মজলিশে ইসলামিয়াতের সভায় এভাষন দেন তিনি, যা পরবর্তীতে ‘ইসলাম ও জাহেলিয়াত’ নামে বই আকারে প্রকাশিত হয়।
ভূমিকা:
আচরনের সাধারন নীতি:
- কোন ব্যক্তি বা বস্তুর সাথে সম্পর্ক স্থাপন, আচরন, ব্যবহারের পূর্বেই তার সম্পর্কে ধারনা নেয়া।
- ব্যক্তি বা বস্তুর অভ্যন্তরীন নির্ভুল জ্ঞান লাভ করা সম্ভব না হলে বাহ্যিক নিদর্শন সমূহ থেকে ধারনা গ্রহন করতে হবে।
- নির্ধারিত ধারনার ভিত্তিতে ভালবাসা, ভয়, সম্মান, উপেক্ষা, রক্ষনাবেক্ষন, পরিত্যাগ ইত্যাদি হয়ে থাকে।
- প্রাপ্ত জ্ঞান বা ধারনা যত নির্ভুল হবে আচরন বা ব্যবহার তত নির্ভুল হবে।
জ্ঞানের সাধারন উৎস:
যে কোন বিষয়ে জ্ঞান লাভেরউৎস- ৩ টি
- ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পর্যবেক্ষন,
- আন্দাজ, অনুমান বা অমূলক ধারনা,
- নির্ভূল বিজ্ঞান
মানব জীবনের মৌলিক সমস্যা:
১. মানব মনের স্বাভাবিক প্রশ্ন:
- ক) নিজ সত্ত্বা সম্পর্কিত প্রশ্ন।
- খ) মানব সমাজ সম্পর্কিত প্রশ্ন।
- গ) বিশ্ব প্রকৃতি ও বস্তুজগৎ সম্পর্কিত প্রশ্ন।
২. মানব মান ও প্রশ্নের উত্তর:
- সকল মানুষের মনে এর উত্তর বিদ্যমান তবে সকলের কাছে এর দার্শনিক উত্তর নাও থাকতে পারে।
- চিন্তা সংগঠিত বা অসংগঠিত হতে পারে এবং এর ভিত্তিতে কর্ম সম্পাদিত হয়।
- মানুষের সকল কর্ম তার একটি চিন্তা বা দর্শনের প্রতিফলন।
৩. উত্তরের গুরুত্ব:
- উত্তরের গুরুত্ব ব্যক্তি, দল বা জাতির জন্যে সমান।
- এর ভিত্তিতে সমাজ,রাষ্ট্র বা সভ্যতার জন্য বিধান কর্মসূচী রচিত হয়।
- এর ভিত্তিতে নৈতিক মূল্যায়ন নির্ধারন জীবনের বিভিন্ন দিক ও বিভাগের বাস্তবরুপ হবে।
- চিন্তা ও দর্শন থেকে যেমন বাস্তব রুপায়ন হয় তেমনি বাস্তব আচরন থেকে চিন্তা বা দর্শন পাওয়া যায়।
৪. প্রশ্নপত্রের উত্তরের উৎস:
- যেহেতু প্রশ্নগুলো ব্যক্তিগত কোন বিষয়ে নয় এ কারনে কোথাও উত্তরসুনির্দিষ্টভাবে লেখা নেই যে জম্মের পরপর পড়ে নিজ যোগ্যতা বলে বুঝে নিবে।
- উত্তর এমন সহজও সুস্পষ্ট নয় যে প্রত্যেকে তা সহজেই জেনে যাবে।
- এ সকল পন্থায় প্রাপ্ত উত্তরসমূহ কি কি?
৫. উত্তর নির্ধারনের উপায়:
- নিজের বাহ্যন্দ্রিয়ের উপর নির্ভর করা এবং তদলব্দ জ্ঞানের ভিত্তিতে উত্তর নির্ধারন।
- ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে পর্যবেক্ষন এবং এর সাথে অনুমান ধারনা যোগ করে একটি নীতি ঠিক করা।
- আল্লাহ প্রেরিত নবীগন প্রকৃত সত্য জানা দাবী করে উক্ত প্রশ্নাবলীর যে উত্তর দিয়েছের তা গ্রহন করা।
উত্তরের বিভিন্নতার প্রভাব: উত্তর লাভের জন্য আজ পর্যন্ত ব্যবহৃত পন্থা তিন টি।
- প্রত্যেকটির উত্তর স্বতন্ত্র আচরন নীতি
- নৈতিক আদর্শস্বতন্ত্র
- সাহিত্য সাংস্কৃতির ব্যবস্থাও স্বতন্ত্র
নির্ভেজাল ও শিরক মিশ্রিত জাহেলিয়াতের পার্থক্য:
- শিরকে পূজা মানত অর্ঘ্য ইত্যাদি অনুষ্ঠানের আধিক্য নির্ভেজালে এসবেরঅস্তিত্ব নেই। কিন্তু নৈতিক চরিত্র ও কর্মের ক্ষেত্রে কোন তফাৎ নেই।
- শিরকের শিক্ষা শিক্ষাদর্শন। সাহিত্য রাজনীতির জন্য পৃথক কোন মূলনীতি নেই। তাই নির্ভেজাল থেকে তা গ্রহন করে।
- মুশরিক কল্পনা বিলাসী। নির্ভেজাল বাস্তব কর্মী।
- শিরকের রাজ্যে রাজা ও ধর্মীয় নেতাগন খোদার আসনে। বংশ এবং শ্রেণী প্রধানের উপর এ মতবাদ প্রতিষ্ঠিত।
- নির্ভেজালের রাজত্বে পরিবার পূজা, বংশপূজা, জাতি পূজা, একনায়কতন্ত্র, সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ শ্রেণী সংগ্রামে পরিগ্রহ হয়।
বৈরাগ্যবাদ:
বাস্তব পর্যবেক্ষনের সাথে আন্দাজ অনুমানের সংমিশ্রনেমানবজীবনের মৌলিক প্রশ্নসমূহের যে সব উত্তর ঠিক হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হল বৈরাগ্যবাদ।
বৈশিষ্ট্য:
- ১. পৃথিবীএবং মানুষের শারীরিক স্বত্বাস্বয়ংমানুষের জন্যএকটি শান্তি কেন্দ্রবিশেষ আর মানুষের আত্নাকে দন্ডপ্রাপ্তকয়েদীর ন্যায়পিঞ্জিরাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে।
- ২. ঈন্দ্রিয়ের সকল প্রয়োজন ও বাসনা বন্দী খানার শৃংখলের ন্যায়।
- ৩. মুক্তি লাভের একমাত্র উপায় প্রকৃতিগত বিভিন্ন প্রয়োজনকে কঠোরভাবেঅবদমিত করা, স্বাদ আস্বাসন পরিহার করা এবং দেহ মনের কঠোর কৃচ্ছ সাধন।
- ৪. স্রষ্টার অস্তিত্ব ও অন্যান্য মৌলিক ব্যাপারে এর সুস্পষ্ট বক্তব্য নেই কার্যত নিরব।
সর্বেশ্বরবাদ:
অবাস্তব আন্দাজ অনুমান ভিত্তিক পর্যবেক্ষন ও অনুশীলনের ফলে তৃতীয় যে মতটির সৃষ্টি হচ্ছে তা হচ্ছে সর্বেশ্বরবাদ।
বৈশিষ্ট্য: ১. বিশ্ব প্রকৃতির আলাদা কোন সত্তা নেই। মূলত একটি সত্তাই সমস্ত বস্তুজগতের মাধ্যমে স্বত:স্ফূর্তভাবে প্রকাশমান।
ইসলাম:
মানুষ ও বিশ্ব প্রকৃতি সম্পর্কে মৌলিক প্রশ্নসমূহের যে জওয়াবআল্লাহ প্রেরিত নবীগন দিয়েছেন তা আন্তরিকতা সহকারে পূর্ণরুপে গ্রহন করারনামই ইসলাম।
নির্ভুল পথ লাভের সাধারন নিয়ম:
১. পথ অনুসন্ধান:
- কোন অপরিচিত স্থানে পরিভ্রমন।
- কোন রুপ অভিজ্ঞতা না থাকলে অন্য কারো নিকট হতে জিজ্ঞাসা।
- পথ নির্দেশ লাভ ও সে স্থানে ভ্রমন।
বৈজ্ঞানিক পন্থা:– এক্ষেত্রে পূর্ণ অভিজ্ঞতার পূর্ন দাবীদার খোজা।
- দাবীদার বিশ্বাসযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য কিনা তা যাচাই করা।
- দাবীদারের নেতৃত্বে পথ চলা।
- বাস্তব অভিজ্ঞতার দাবী প্রমাণ।
মানুষ ও বিশ্ব সম্পর্কে নবীর মত:
- ১. বিশ্বজাহান সৃষ্টি ও পরিচালনা করেন মহান আল্লাহ।
- ২. মানব সৃষ্টি ও তার অবস্থান।
- ৩.মানুষের পারস্পরিক আচরন ও বস্তুসামগ্রী ব্যবহার নীতি।
- ৪. আল্লাহর বিধান প্রদর্শনের দায়িত্ব রাসূল সা: এর উপর।
- ৫. মানুষের মর্যাদা ও দায়িত্ব।
- ৬. পরকালীন জীবন ও জবাবদিতা।
মানুষের তৎকালীন সাফল্য দুটি বিষয়ের উপর নির্ভরশীল:
- ১. মানুষ নিজের বুদ্ধি, বিবেক, প্রতিভার নির্ভুল প্রয়োগের মাধ্যমেআল্লাহতায়ালাকে প্রকৃত ও একমাত্র ব্যবস্থাপক ও আইন রচয়িতা এবং তার নিকটহতেপ্রাপ্ত শিক্ষা ও বিধানকে যথার্থ আল্লাহর বিধান হিসেবে জানতে পারলো কিনা?
- ২. এ নিগূঢ় সত্য জেনে নেওয়ার পর পথ নির্বাচনের স্বাধীনতা থাকা সত্বেওমানুষ নিজের আন্তরিক ইচ্ছা ও আগ্রহ সহকারে আল্লাহ তায়ালার বাস্তব প্রভূত্ব ওশরীয়তী বিধানের কাছে মাথা নত করলো কিনা?
ইসলামী মতবাদ:
- ১. বৈজ্ঞানিক, নির্ভুল ও পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা।
- ২. ফিতরাতের বিধান এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা উত্তরন।
- ৩. পার্থিব জীবনে এরফলাফল:
- ক) ব্যক্তিগত জীবনে দায়িত্বশীলতা ও উন্নত নৈতিকতা।
- খ) বৈষম্যহীন ও নিরপরাধ সমাজ ব্যবস্থা।
- গ) ইসলামের সার্বজনীনতা ও সরলতা।
- ঘ) রাষ্ট্রব্যবস্থার বুনিয়াদ মানব প্রভুত্বের উপর নয়, আল্লাহর প্রভুত্বের উপর।
- ঙ) সমাজ ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আত্নপূজার পরিবর্তে আনুগত্য।
- চ) বাস্তব অভিজ্ঞতা ও আহবান।
নবীদের উপস্থাপিত পথে পরিচালনা করতে হবে। সুতরাং নবীদের আনীত পথ তথা ইসলাম সঠিক পথ এবং এটাই একমাত্র অনুসরনীয়।
